বিশ্ব প্লাস্টিক সার্জারি দিবসে লিম্ফেডিমা প্রতিরোধ ও চিকিৎসা সচেতনতার বার্তা মণিপাল হাসপাতাল ইএম বাইপাসের
বকুল দাশ, কলকাতা, ১৫ জুলাই ২০২৬ : বিশ্ব প্লাস্টিক সার্জারি দিবস উপলক্ষে সাহস, লড়াই এবং সুস্থ হয়ে ওঠার গল্পকে সামনে এনে মণিপাল হাসপাতাল ইএম বাইপাস এমন দুই রোগীকে সংবর্ধনা জানালো, যাঁরা উন্নত প্লাস্টিক ও রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জারির মাধ্যমে জটিল শারীরিক সমস্যাকে সফলভাবে জয় করেছেন। এই চিকিৎসা করেছেন মণিপাল হাসপাতাল ইএম বাইপাসের প্লাস্টিক ও রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জারি বিভাগের প্রধান ও সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডাঃ সিনজিনি দাস এবং অ্যাসোসিয়েট কনসালট্যান্ট ডাঃ শুভম কেজরিওয়াল। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মণিপাল অনকোলজি সার্ভিসেস-এর ডিরেক্টর ও হেড অ্যান্ড নেক অনকোলজি সার্জারির সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডাঃ সৌরভ দত্ত এবং গাইনোকোলজিক অনকোলজি বিভাগের প্রধান ডাঃ অরুণাভ রায়। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তুলে ধরা হয় যে, প্লাস্টিক ও রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জারি শুধুমাত্র সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য নয়। শরীরের ক্ষতিগ্রস্ত অংশের কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে আনা, চলাফেরার সক্ষমতা বাড়ানো এবং রোগীর জীবনযাত্রার মান উন্নত করতেও এই চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
এবারের বিশ্ব প্লাস্টিক সার্জারি দিবসে হাসপাতাল বিশেষভাবে লিম্ফেডিমা সম্পর্কে সচেতনতার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। লিম্ফেডিমা এমন একটি সমস্যা, যেখানে শরীরের টিস্যুতে লিম্ফ অর্থাৎ তরল জমে গিয়ে শরীরের কোনও অংশ ফুলে যায়। এটি সাধারণত ক্যানসারের চিকিৎসার পর দেখা দিতে পারে এবং রোগীর স্বাভাবিক চলাফেরা ও জীবনযাত্রায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে। অনুষ্ঠানে দুই মহিলার অনুপ্রেরণামূলক অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়—একজনের ক্ষেত্রে লিম্ফেডিমা সফলভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে এবং অন্যজন উন্নত রিকনস্ট্রাকটিভ মাইক্রোসার্জারির মাধ্যমে লিম্ফেডিমা থেকে সুস্থ হয়ে উঠেছেন।
চিকিৎসকরা জানান, সময়মতো রোগ ধরা পড়া, উন্নত চিকিৎসা এবং একাধিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সমন্বিত পরিচর্যা রোগীদের আবার স্বাভাবিক ও আত্মবিশ্বাসী জীবনে ফিরতে আস্তে সাহায্য করতে পারে।
অনুষ্ঠানে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানান, ৬৭ বছর বয়সী গৃহবধূ ছবি রানি ঘোষ। গাইনোকোলজিক ক্যানসার ধরা পড়ার পর ২০২৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি তাঁর প্রথম অস্ত্রোপচার হয়। পরে ফলো-আপ পরীক্ষায় তাঁর ডান দিকের কুঁচকিতে একটি ফুলে যাওয়া লিম্ফ নোড ধরা পড়ে, যার জন্য আরও একটি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়। চিকিৎসকেরা জানান, এই অস্ত্রোপচারের ফলে তাঁর ডান পায়ে লিম্ফেডিমা হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তাই তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে আগে থেকেই প্রতিরোধমূলক চিকিৎসার বিষয়ে জানানো হয়।২০২৬ সালের ২০ মার্চ রোবটের সাহায্যে তাঁর ক্যানসারের অস্ত্রোপচার করা হয়। একই অস্ত্রোপচারের সময় উন্নত মাইক্রোসার্জারির মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত লিম্ফ নালিগুলিকে কাছের শিরার সঙ্গে যুক্ত করা হয়, যাতে ভবিষ্যতে লিম্ফেডিমা হওয়ার ঝুঁকি কমে। অস্ত্রোপচারের পর তিনি সফলভাবে রেডিয়েশন থেরাপি সম্পন্ন করেন এবং এখনও পর্যন্ত তাঁর লিম্ফেডিমার কোনও লক্ষণ দেখা যায়নি। বর্তমানে তিনি নিজের সমস্ত দৈনন্দিন কাজ নিজেই করতে পারেন এবং সুস্থ ও সক্রিয় জীবনযাপন করছেন।
নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে ছবি রানি ঘোষ বলেন, "যখন আমাকে জানানো হয় যে আবার অস্ত্রোপচার করতে হবে, তখন খুব ভয় পেয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, হয়তো আর স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারব না। কিন্তু চিকিৎসকদের উন্নত চিকিৎসা এবং সবসময় পাশে থাকার জন্য আমি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠি এবং যে ফোলা হওয়ার ভয় ছিল, তা আর হয়নি। এখন আমি নিজের সব গৃহস্থালির কাজ করতে পারি, স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারি এবং ভালোভাবে জীবন কাটাচ্ছি। মণিপাল হাসপাতাল ইএম বাইপাসের পুরো চিকিৎসক দলকে আমি আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাই।"
অনুষ্ঠানে সংবর্ধনা দেওয়া হয় আরও এক রোগী, ৫৮ বছর বয়সী গৃহবধূ সুমিতা ভট্টাচার্য-কেও। ২০২০ সালে গাইনোকোলজিক ক্যানসারের জন্য অস্ত্রোপচার এবং কেমোথেরাপির পর তাঁর ডান পায়ে মারাত্মক ফোলা দেখা দেয়, যা ধীরে ধীরে গ্রেড-৩ লিম্ফেডিমায় পরিণত হয়। ফলে সাধারণ দৈনন্দিন কাজ করাও তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। ২০২৬ সালের জুন মাসে মণিপাল হাসপাতাল ইএম বাইপাসে উন্নত সুপারমাইক্রো সার্জারির পর মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যেই তাঁর পায়ের ফোলা অনেকটাই কমে যায় এবং তিনি আবার স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে শুরু করেন।
নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে সুমিতা ভট্টাচার্য বলেন, "বহু বছর ধরে আমি পায়ের ফোলা এবং অস্বস্তি নিয়ে বেঁচে ছিলাম। প্রতিদিনই খুব কষ্ট হতো। মনে হয়েছিল, আর কোনওদিন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারব না। কিন্তু অস্ত্রোপচারের পর আমার জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এখন আমি স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারি, নিজের দৈনন্দিন কাজ করতে পারি এবং আগের মতো ব্যথা ও ভারী অনুভূতি আর নেই। নতুন জীবন উপহার দেওয়ার জন্য আমি চিকিৎসক এবং মণিপাল হাসপাতাল ইএম বাইপাসের পুরো দলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।"
এই বিষয়ে মণিপাল হাসপাতাল ইএম বাইপাসের প্লাস্টিক ও রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জারি বিভাগের প্রধান ও সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডাঃ সিনজিনি দাস বলেন, "বিশ্ব প্লাস্টিক সার্জারি দিবস মানুষকে প্লাস্টিক সার্জারির রিকনস্ট্রাকটিভ দিক সম্পর্কে সচেতন করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এই চিকিৎসার লক্ষ্য শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনা নয়, বরং শরীরের স্বাভাবিক কাজের ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া এবং রোগীর জীবনযাত্রার মান উন্নত করা। ক্যানসারের অস্ত্রোপচার, রেডিয়েশন, আঘাত, সংক্রমণ বা জন্মগত কারণে লিম্ফেডিমা হতে পারে। বর্তমানে লিম্ফ্যাটিকোভেনাস অ্যানাস্টোমোসিস (LVA) এবং ভাসকুলারাইজড লিম্ফ নোড ট্রান্সফার (VLNT)-এর মতো উন্নত মাইক্রোসার্জারির ফলে লিম্ফেডিমার চিকিৎসায় অনেক ভালো ফল পাওয়া যাচ্ছে। এতে ফোলা কমে, বারবার সংক্রমণের ঝুঁকি হ্রাস পায় এবং রোগীরা আবার স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন। সময়মতো রোগ ধরা পড়া, দ্রুত বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো এবং একাধিক বিভাগের চিকিৎসকদের সমন্বিত চিকিৎসাই সবচেয়ে ভালো ফল দিতে পারে।"
অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মণিপাল হাসপাতাল ইএম বাইপাসের পক্ষে জানানো হয়, লিম্ফেডিমার ক্ষেত্রে দ্রুত রোগ নির্ণয়, সময়মতো চিকিৎসা শুরু এবং বিভিন্ন বিভাগের চিকিৎসকদের একসঙ্গে কাজ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব প্লাস্টিক সার্জারি দিবসে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছেন যে, তাঁরা উন্নত রিকনস্ট্রাকটিভ চিকিৎসা, লিম্ফেডিমা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, বিশেষায়িত চিকিৎসার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং এই বিষয়ে গবেষণা ও নতুন প্রযুক্তির উন্নয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
Comments