এক স্ক্যানেই দ্রুত অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা, নতুন উদ্যোগ মণিপাল হসপিটালস ইস্টের
এক স্ক্যানেই দ্রুত অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা, নতুন উদ্যোগ মণিপাল হসপিটালস ইস্টের
বকুল দাশ :: বিশ্ব জরুরি পরিষেবা দিবস উপলক্ষে সময়মতো চিকিৎসার গুরুত্বের বার্তা নিয়ে গত বুধবার, ২৭ মে মণিপাল হসপিটালস ইস্ট তাদের নতুন জরুরি পরিষেবা উদ্যোগ “ওয়ান স্ক্যান ক্যান সেভ আ লাইফ” চালু করল। এই প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হল জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া এবং রোগীদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন হাসপাতালের বিশিষ্ট চিকিৎসকরা, তাঁদের মধ্যে ছিলেন ডাঃ ইন্দ্রনীল দাস, ডাঃ সুজয় দাস ঠাকুর এবং ডাঃ কিশেন গোয়েল। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বহুল প্রতীক্ষিত বাংলা ছবি “ফুলপিশি অ্যান্ড এডওয়ার্ড”-এর শিল্পীরাও। ছবিটি পরিচালনা করেছেন জনপ্রিয় পরিচালক জুটি নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তাঁদের উপস্থিতি এই উদ্যোগে এক সাংস্কৃতিক ও আবেগঘন মাত্রা যোগ করে এবং দ্রুত জরুরি পরিষেবার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর বার্তাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
এই উদ্যোগে একটি কিউআর-কোড ভিত্তিক জরুরি পরিষেবা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কোনও ব্যক্তি কিউআর কোড স্ক্যান করলেই সরাসরি অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন, নিজের লাইভ লোকেশন শেয়ার করতে পারবেন এবং জরুরি চিকিৎসা পরিষেবা দ্রুত সক্রিয় করতে পারবেন। বিশেষ করে “গোল্ডেন আওয়ার”-এ, অর্থাৎ জরুরি ঘটনার পর প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যে দ্রুত চিকিৎসা পেলে রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অনেকটাই বেড়ে যায়। এই প্রযুক্তি মণিপাল অ্যাম্বুল্যান্স রেসপন্স সার্ভিস (MARS)-এর সঙ্গে যুক্ত, ফলে দ্রুত সমন্বয় ও সময়মতো চিকিৎসা সহায়তা পাওয়া সম্ভব হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ভারতে প্রতি চারটি মৃত্যুর মধ্যে প্রায় একটি হৃদরোগজনিত কারণে ঘটে। হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক জরুরি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। গবেষণায় দেখা গেছে, “গোল্ডেন আওয়ার”-এর মধ্যে চিকিৎসা শুরু করা গেলে হৃদরোগজনিত জরুরি অবস্থায় মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। এছাড়াও, ভারতে প্রতি বছর প্রায় দেড় লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয় সড়ক দুর্ঘটনায়। ট্রমা ও অর্থোপেডিক সমস্যাও জরুরি চিকিৎসার অন্যতম বড় কারণ।
স্নায়ুরোগজনিত জরুরি পরিস্থিতি নিয়ে ডাঃ জয়ন্ত রায় বলেন, “স্ট্রোকের ক্ষেত্রে সময়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বলা হয় ‘টাইম ইজ ব্রেন’, কারণ স্ট্রোক শুরু হওয়ার পর প্রতি মিনিটে প্রায় ১৯ লক্ষ মস্তিষ্কের কোষ নষ্ট হতে পারে। চিকিৎসায় দেরি হলে স্থায়ী মস্তিষ্কের ক্ষতি, দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যা বা মৃত্যুও হতে পারে। তাই দ্রুত উপসর্গ চেনা, তৎক্ষণাৎ জরুরি পরিষেবার সঙ্গে যোগাযোগ করা এবং দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। সচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুত জরুরি পরিষেবা এবং সহজলভ্য স্বাস্থ্যব্যবস্থা রোগীদের গোল্ডেন আওয়ারের মধ্যে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা পেতে সাহায্য করবে।”
হৃদরোগজনিত জরুরি পরিস্থিতি নিয়ে ডাঃ দিলীপ কুমার বলেন, “হৃদরোগজনিত জরুরি অবস্থায় সবচেয়ে বড় সমস্যা হল উপসর্গ শুরু হওয়ার পর চিকিৎসা পেতে দেরি হওয়া। আতঙ্ক, সচেতনতার অভাব বা দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানোর অসুবিধার কারণে অনেক সময় নষ্ট হয়। ‘ওয়ান স্ক্যান ক্যান সেভ আ লাইফ’-এর মতো উদ্যোগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি জরুরি অবস্থায় দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা পাওয়ার প্রক্রিয়াকে সহজ করে। দ্রুত অ্যাম্বুল্যান্স সংযোগ ও দ্রুত পরিষেবা সমন্বয়ের মাধ্যমে রোগীরা সময়মতো চিকিৎসা পেতে পারবেন, যখন প্রতিটি সেকেন্ড অত্যন্ত মূল্যবান। হৃদরোগের প্রথম লক্ষণ দেখা দিলেই দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং জরুরি পরিষেবা আরও সহজলভ্য করা মৃত্যুহার কমাতে সাহায্য করবে।”
ডাঃ দেবাশিস চক্রবর্তী বলেন, “সড়ক দুর্ঘটনা ও ট্রমাজনিত আঘাত এখনও বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। ভাঙা হাড়, স্পাইনাল ইনজুরি, মাথায় আঘাত এবং অন্যান্য গুরুতর অর্থোপেডিক সমস্যায় দ্রুত চিকিৎসা অত্যন্ত জরুরি। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে কলকাতায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ১৯১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং বহু মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন। দুর্ঘটনার পর প্রথম কয়েক মিনিট খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ চিকিৎসায় দেরি হলে স্থায়ী শারীরিক অক্ষমতা বা প্রাণহানির ঝুঁকি বেড়ে যায়। দ্রুত অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা ও সমন্বিত ট্রমা কেয়ার রোগীর জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ‘ওয়ান স্ক্যান ক্যান সেভ আ লাইফ’-এর মতো উদ্যোগ দ্রুত চিকিৎসা পৌঁছে দিতে সাহায্য করবে।”
এই উদ্যোগ সম্পর্কে ডাঃ সুজয় দাস ঠাকুর বলেন, “যে কোনও জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতিতে প্রতিটি সেকেন্ড খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় রোগীর কাছে দ্রুত পৌঁছানো বা রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে আনা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ‘ওয়ান স্ক্যান ক্যান সেভ আ লাইফ’ উদ্যোগটি প্রযুক্তির মাধ্যমে জরুরি পরিষেবাকে আরও সহজ করার জন্য তৈরি হয়েছে। শুধু কিউআর কোড স্ক্যান করলেই মানুষ সরাসরি অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন, লাইভ লোকেশন শেয়ার করতে পারবেন এবং দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা পেতে পারবেন। হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, দুর্ঘটনা বা যে কোনও হঠাৎ শারীরিক সমস্যায় এটি অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা অনেক বাড়িয়ে দেয়। প্রযুক্তির পাশাপাশি এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার মানসিকতা তৈরি করা।”
এই উদ্যোগের লক্ষ্য সাধারণ মানুষের মধ্যে জরুরি পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং সবাইকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করা। প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থার মাধ্যমে মণিপাল হসপিটালস ইস্ট জরুরি চিকিৎসা পরিষেবাকে আরও সহজ, দ্রুত এবং কার্যকর করে তুলতে চায়।
Comments