ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে ব্লাডার ক্যানসার জয়ীদের একত্র করল মণিপাল হাসপাতাল, ইএম বাইপাস

 

আলেফা বেগম, কলকাতা, ২৩ মে ২০২৬ : কলকাতার ঐতিহাসিক ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামের শান্ত ও ঐতিহ্যময় পরিবেশে ভয়কে হার মানিয়ে শোনা গেল সাহস, লড়াই এবং নতুন জীবনের গল্প। ব্লাডার ক্যানসার অ্যাওয়ারনেস মাস উপলক্ষে মণিপাল হাসপাতাল, ইএম বাইপাস আয়োজন করেছিল একটি বিশেষ ‘ব্লাডার ক্যানসার চ্যাম্পিয়ন্স’ মিট’, যেখানে উপস্থিত ছিলেন ব্লাডার ক্যানসার থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা রোগী, তাঁদের পরিবার, চিকিৎসক এবং সেবাকর্মীরা। এই অনুষ্ঠান শুধু রোগমুক্তির গল্পই নয়, বরং এক কঠিন অসুখের বিরুদ্ধে মানুষের অসাধারণ মানসিক শক্তি ও ইতিবাচক মনোভাবের উদযাপন হয়ে উঠেছিল। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ডাঃ অভয় কুমার, ডিরেক্টর – ইউরোলজি এবং ইউরো-অঙ্কোলজি, মণিপাল হাসপাতাল, ইএম বাইপাস; ডাঃ সায়ন ভট্টাচার্য, ডিরেক্টর, ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম, কলকাতা (সংস্কৃতি মন্ত্রক, ভারত সরকার) এবং অন্যান্য সিনিয়র চিকিৎসকরা। 


ভারতে ব্লাডার ক্যানসারের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। দেশে প্রতি বছর প্রায় ২৫,০০০ থেকে ২৬,০০০ নতুন ব্লাডার ক্যানসারের রোগী ধরা পড়তে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। বিভিন্ন চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যানসার শনাক্তকরণ ও রিপোর্টিং ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় এই সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। ভারতে পুরুষদের মোট ক্যানসারের মধ্যে প্রায় ৩% থেকে ৪% ব্লাডার ক্যানসার এবং এটি মহিলাদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে প্রায় চার গুণ বেশি দেখা যায়। কিন্তু এত সংখ্যক রোগী থাকা সত্ত্বেও এই রোগের উপসর্গ, প্রাথমিক লক্ষণ এবং সময়মতো চিকিৎসা সম্পর্কে সচেতনতা এখনও খুব কম। তাই এই ধরনের উদ্যোগ মানুষকে সচেতন করতে, দ্রুত পরীক্ষা করাতে এবং রোগীদের মানসিকভাবে শক্তি জোগাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলে মত প্রকাশ করে ডাঃ অভয় কুমার বলেন, “ব্লাডার ক্যানসার অনেক সময় অবহেলিত থেকে যায়, যার ফলে রোগ ধরা পড়ে দেরিতে এবং চিকিৎসা আরও কঠিন হয়ে ওঠে। আমাদের লক্ষ্য সবসময় আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে রোগীকেন্দ্রিক চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়া, যাতে রোগীরা দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন। রোবোটিক সার্জারি চিকিৎসায় আরও নিখুঁত ফল এবং দ্রুত সুস্থতা এনে দিয়েছে। এই ধরনের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমরা মানুষের মধ্যে আরও সচেতনতা বাড়াতে এবং ভুল ধারণা দূর করতে চাই। ২০২৩ সালে আমরা ব্লাডার ক্যানসার সাপোর্ট গ্রুপও শুরু করেছি। তারপর থেকে রোগী ও সুস্থ হওয়া মানুষরা নিয়মিত একত্রিত হয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিচ্ছেন এবং একে অপরকে মানসিকভাবে শক্তি দিচ্ছেন।”


এই অনুষ্ঠানে ডঃ সায়ন ভট্টাচার্য বলেন, “বর্তমানে মিউজিয়ামের ভূমিকা অনেকটাই বদলে যাচ্ছে। এগুলি এখন এমন এক সাংস্কৃতিক জায়গা হয়ে উঠছে, যেখানে সমাজের নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় এবং মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়। ‘বিকাশ ভি, বিরাসত ভি’-র ভাবনাকে সামনে রেখে ২১২ বছরের ঐতিহ্যবাহী ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম সমাজের সব স্তরের মানুষের জন্য আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে উঠছে। আজকের দ্রুত বদলে যাওয়া সময়ে ক্যানসার জয়ীদের অভিজ্ঞতা এবং তাঁদের পরিবারের লড়াইও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই গল্পগুলি সাহস, মানবিকতা এবং জীবনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাবের প্রতীক। ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই কখনও একজন মানুষের একার লড়াই নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকেন পরিবার, চিকিৎসক, সেবাকর্মী এবং পুরো সমাজ। এই ধরনের উদ্যোগ মানুষকে সাহস দেয়, রোগ নিয়ে খোলাখুলি কথা বলতে উৎসাহিত করে এবং আরও সহানুভূতিশীল সমাজ গড়ে তুলতে সাহায্য করে।”


নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে তাপস কর্মকার, ৪৫ বছর বয়সী এক ব্লাডার ক্যানসার জয়ী, বলেন, “২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে যখন জানতে পারি যে আমার মাংসপেশিতে ছড়িয়ে পড়া ব্লাডার ক্যানসার হয়েছে, তখন যেন আমার জীবন থমকে গিয়েছিল। কেমোথেরাপি এবং বড় অপারেশনের সময় শারীরিক ও মানসিকভাবে খুব কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। কিন্তু চিকিৎসক, পরিবার এবং সেবাকর্মীরা আমাকে লড়াই করার শক্তি দিয়েছে। ডাঃ অভয় কুমার এবং তাঁর টিমের তত্ত্বাবধানে আমি চার দফা কেমোথেরাপি এবং পরে অপারেশন করাই, যেখানে ক্যানসারে আক্রান্ত ব্লাডারটি সরিয়ে নতুনভাবে প্রস্রাব সংরক্ষণ ও নির্গমনের ব্যবস্থা করা হয়। এখন আমি সম্পূর্ণ রোগমুক্ত এবং সুস্থ জীবনযাপন করছি। আমার বার্তা একটাই — ক্যানসার মানেই শেষ নয়। সময়মতো চিকিৎসা, সঠিক পরামর্শ এবং ইতিবাচক মনোভাব জীবন বদলে দিতে পারে। এই ধরনের অনুষ্ঠান রোগীদের আশা এবং আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয় যে তাঁরা একা নন।”

৬২ বছর বয়সী ব্লাডার ক্যানসার জয়ী সোমা দাস (নাম পরিবর্তিত) বলেন, “যখন জানতে পারি আমার ব্লাডারে টিউমার হয়েছে, তখন খুব ভয় এবং উদ্বেগে ছিলাম। কারণ এর আগেই আমার ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং থাইরয়েডের সমস্যা ছিল। কিন্তু চিকিৎসকদের আত্মবিশ্বাস এবং সমর্থন আমাকে সাহস জুগিয়েছে। ডাঃ কুমার এবং তাঁর টিমের তত্ত্বাবধানে আমার সফল রোবোটিক সার্জারি হয়। চিকিৎসা এবং নিয়মিত ফলো-আপের পরে এখন আমি সম্পূর্ণ সুস্থ। আমার সকলের কাছে অনুরোধ — কোনও উপসর্গকে অবহেলা করবেন না। সময়মতো চিকিৎসা জীবন বাঁচাতে পারে।”

Comments

Popular posts from this blog

ক্যান্সার বিজয়ীদের কন্ঠে সচেতনতা ও শক্তির গল্প*

আর পি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের উদ্যোগে আইকনিকের হলে ‘রং মহোৎসব ২.০'

হাফমুন এন্টারটেইনমেন্ট"এর নতুন শিল্প সংযোজনা