ডাঃ সরোজ গুপ্তের আদর্শ আজও প্রেরণা, ৫৩ বছরে পদার্পণ করল এসজিসিসিআরআই
ডাঃ সরোজ গুপ্তের আদর্শ আজও প্রেরণা, ৫৩ বছরে পদার্পণ করল এসজিসিসিআরআই
আলেফা বেগম,
কলকাতা, ২১ মে, ২০২৬ : প্রখ্যাত ক্যানসার রোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ সরোজ গুপ্তের ১৬তম প্রয়াণবার্ষিকী স্মরণ উপলক্ষে বৃহষ্পতিবার একত্রিত হলেন চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও সরোজ গুপ্ত ক্যানসার সেন্টার অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসজিসিসিআরআই)-এর সঙ্গে যুক্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। একইসঙ্গে উদ্যাপিত হল মানবসেবায় প্রতিষ্ঠানের ৫৩ বছরের পথচলা।
দিনের সূচনা হয় রক্তদান শিবির এবং প্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গণে ডাঃ সরোজ গুপ্তের মূর্তিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মাধ্যমে। পূর্ব ভারতের ক্যানসার চিকিৎসার মানচিত্র বদলে দেওয়া এই দূরদর্শী চিকিৎসককে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন উপস্থিত সকলে।
সন্ধ্যায় প্রেস ক্লাব কলকাতায় প্রকাশিত হয় স্মারক গ্রন্থ “A Visionary: The Life and Legacy of Dr. Saroj Gupta”। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক, এবং কলকাতার শেরিফ গৌতম ঘোষ।
অনুষ্ঠানে গৌতম ঘোষ, ডাঃ সরোজ গুপ্তের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে ক্যানসার চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়ার আজীবন প্রয়াসের কথা স্মরণ করেন।
গ্রন্থটিতে উঠে এসেছে এক তরুণ সমাজমনস্ক চিকিৎসক থেকে দেশের অন্যতম শ্রদ্ধেয় অনকোলজিস্ট হয়ে ওঠার ডাঃ সরোজ গুপ্তের দীর্ঘ যাত্রাপথ। পাশাপাশি, এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সংগ্রামের কথাও তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে রোগীরা মর্যাদা, সহমর্মিতা ও আশার সঙ্গে চিকিৎসা পেতে পারেন।
১৯২৯ সালের ৫ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন ডাঃ সরোজ গুপ্ত। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ক্যানসার সেন্টার ওয়েলফেয়ার হোম অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট, যা বর্তমানে সরোজ গুপ্ত ক্যানসার সেন্টার অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট নামে পরিচিত, ছিল পূর্ব ভারতের প্রথম বেসরকারি অ-লাভজনক ক্যানসার হাসপাতাল। এমন এক সময়ে, যখন বিশেষায়িত ক্যানসার চিকিৎসা অধিকাংশ মানুষের নাগালের বাইরে ছিল, তখনই মানবিক ও সুলভ চিকিৎসা পরিষেবার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি।
দান হিসেবে পাওয়া জলাভূমির জমিতে শুরু হওয়া সেই প্রতিষ্ঠান আজ দেশের অন্যতম আধুনিক ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র। বর্তমানে এসজিসিসিআরআই-এ রয়েছে অত্যাধুনিক রেডিয়েশন অনকোলজি পরিষেবা, পিইটি-সিটি ইমেজিং, বিশেষায়িত ক্যানসার সার্জারি ইউনিট, মেডিক্যাল অনকোলজি বিভাগ, নিবিড় পরিচর্যা ব্যবস্থা এবং বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট সুবিধা।
শিশু ক্যানসার রোগীদের জন্য তৈরি বিশেষ পরিকাঠামোও এই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কৃত্রিম পাহাড়, জলাশয়, টয় ট্রেন এবং অডিটোরিয়াম-সহ এই শিশু বিভাগ চিকিৎসাধীন শিশুদের জন্য এক মানসিক স্বস্তির পরিবেশ গড়ে তুলেছে।
স্বল্পমূল্যের চিকিৎসা পরিষেবার পাশাপাশি, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ গবেষণার মাধ্যমে ক্যানসার গবেষণাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এসজিসিসিআরআই। পাশাপাশি, বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকায় সচেতনতা এবং প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দিতে নিয়মিত কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
অনুষ্ঠানে এসজিসিসিআরআই-এর অনারারি সেক্রেটারি অঞ্জন গুপ্ত বলেন, “আমার বাবা কখনও চিকিৎসাকে শুধুমাত্র পেশা হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে প্রতিটি রোগী ছিল একটি পরিবার, একটি সংগ্রামের গল্প। তিনি বিশ্বাস করতেন, আর্থিক অসুবিধার কারণে কারও চিকিৎসা বন্ধ হওয়া উচিত নয়। এই বই তাঁর আদর্শ আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক আন্তরিক প্রয়াস।”
এসজিসিসিআরআই-এর মেডিক্যাল ডিরেক্টর ও অনকো সার্জন ডাঃ অর্ণব গুপ্ত বলেন,
“তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, চিকিৎসাগত দক্ষতার পাশাপাশি সহমর্মিতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। রোগীকেন্দ্রিক চিকিৎসা পদ্ধতি জনপ্রিয় হওয়ার বহু আগেই তিনি প্রতিদিন সেই দর্শন মেনে চলতেন। তাঁর আদর্শ আজও এই প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের অনুপ্রাণিত করে।”
ডাঃ সরোজ গুপ্তের কন্যা সুস্মিতা রায় তাঁর পিতার ব্যক্তিগত জীবনের নানা স্মৃতি ভাগ করে নেন। ব্যস্ত চিকিৎসক জীবনের মধ্যেও তিনি কীভাবে গভীর মানবিকতা বজায় রেখেছিলেন, সে কথাও তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি সঙ্গীত, সাহিত্য, সিনেমা ও শিল্পকলার প্রতি তাঁর ভালোবাসার প্রসঙ্গও উঠে আসে।
স্মারক গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে ইলা গুপ্তকে, যিনি নীরবে পাশে থেকে ডাঃ সরোজ গুপ্তের সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, সমাজকর্মী এবং সংস্কৃতি জগতের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি। তাঁদের অনেকেই ডাঃ সরোজ গুপ্তকে শুধু পথপ্রদর্শক অনকোলজিস্ট হিসেবেই নয়, এক অসাধারণ মানবিক ব্যক্তিত্ব হিসেবেও স্মরণ করেন, যাঁর আদর্শ আগামী প্রজন্মকেও সমানভাবে অনুপ্রাণিত করবে।





Comments