ক্যান্সার লড়াই থেকে নাটকের মঞ্চ :: বিশ্ব ক্যান্সার দিবসে ক্যান্সার জয়ীদের সম্মাননা জানালো মেডিকা

 

ক্যান্সার লড়াই থেকে নাটকের মঞ্চ :: বিশ্ব ক্যান্সার দিবসে ক্যান্সার জয়ীদের সম্মাননা জানালো মেডিকা 

সাজাহান সিরাজ :: বিশ্ব ক্যান্সার দিবস, ৪ ফেব্রুয়ারি মেডিকা সুপার স্পেশালিটি হসপিটাল (মনিপাল হসপিটাল গ্রুপের একটি অংশ) একদম অন্য ভাবে পালন করল। 

উইলিয়াম শেকসপিয়র 

বলেছিলেন,"পুরো বিশ্ব একটি নাট্যমঞ্চ, নারী ও পুরুষ স্রেফ সেখানে অভিনয় করে যাচ্ছে"। 

এদিন, মেডিকা সকল ক্যান্সারজয়ীদের সুযোগ দিল নিজেদের জীবনের লড়াইয়ের কথা তুলে ধরার। জয়ীরা নিজেদের লড়াইকে সামনে রেখে অসাধারণ পারফরম্যান্স করে দেখালেন। 



আজ অর্থাৎ বিশ্ব ক্যান্সার দিবসে মেডিকা সুপার স্পেশালিটি হসপিটাল আয়োজন করেছিল ক্যান্সার সারভাইভার মিট, যেখানে উপস্থিত ছিলেন ক্যান্সার জয়ী খ্যাতনামা নাট্য ব্যক্তিত্ব চন্দন সেন, প্রফেসর (ডাঃ) সুবীর গাঙ্গুলি, সিনিয়র কনসালটেন্ট, এডভাইজার, রেডিয়েশন অনকোলজি; ডাঃ সৌরভ দত্ত, ডিরেক্টর, মেডিকা অনকোলজি এবং সিনিয়র কনসালটেন্ট, হেড এবং নেক অঙ্কো সার্জারি; ডাঃ অভয় কুমার, সিনিয়র কনসালটেন্ট এবং বিভাগীয় প্রধান (ইউরোলজি, সার্জিক্যাল অনকোলজি, রোবটিক সার্জারি), ডাঃ অরুণাভ রায়, সিনিয়র কনসালটেন্ট এবং বিভাগীয় প্রধান, গাইনিকোলজিক অনকোলজি এবং রোবটিক সার্জারি। 

সভাগৃহ জুড়ে একসাথে করতালি মধ্যে ক্যানসারজয়ীরা, তাদের পরিবার ও ডাক্তাররা একসাথে লড়াই, আশা ও শক্তির কথা তুলে ধরেন।

এদিনের অনুষ্ঠান মঞ্চে ডাঃ সৌরভ দত্ত ঘোষণা করেন ক্যান্সার জয়ীদের নিয়ে মেডিকা একটি নাট্যদল তৈরি করবে যার নেতৃত্ব দেবেন বিশিষ্ট অভিনেতা চন্দন সেন। কোন ক্যানসারজয়ীর অভিনয়ে ইচ্ছে থাকলে, তিনি যোগদান করতে পারবেন ওয়ার্কশপে। তাকে তৈরি করে নেবেন অভিনেতা চন্দন সেন। তিনি আরও বলেন, অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে ক্যান্সারজয়ীরা শুধুমাত্র বেঁচে থাকবে না, তার সাথে লাইট, স্টেজ, অ্যাকশন এর মধ্যে জ্বলজ্বল করবেন। ক্যান্সার মানে জীবনের শেষ নয়।




প্রফেসর (ডাঃ) সুবীর গাঙ্গুলি, বলেন, 'এই অনুষ্ঠানের লক্ষ্য হল, সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তোলা, পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করা এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রে যে ফাঁকা জায়গা রয়েছে, সেটি কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে মেডিকা অনকোলজি টিম একাধিক ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। আমরা জানি যে ক্যান্সারের গভীরতা এবং ক্ষতি করার দিকটি অনেক বেশি, কারণ রোগ দেরিতে ধরা পড়া এবং সচেতনতার অভাব এজন্য অনেকটা দায়ী। আমাদের লক্ষ্য হল যে গুণগতমান সহ চিকিৎসা পরিষেবা সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া। এজন্য মেডিকা মনোবিনা ক্লিনিং পরিষেবা চালু করেছে।'

 বিশ্ব ক্যান্সার দিবস ২০২৫ 'ইউনাইটেড বাই ইউনিক' ক্যাম্পেনের প্রথম ধাপ অনুসারে ক্যান্সার কেয়ারের ক্ষেত্রে মানুষ ভিত্তিক পদক্ষেপ এটি।  

ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ (আইসিএমআর) এর তথ্য অনুসারে এই বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে সারা ভারতে ক্যান্সার আক্রান্তের সংখ্যা ১৫.৭ লাখ পৌঁছবে। ২০২২ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৪.৬ লাখ। সারা বিশ্বে ক্যান্সার আক্রান্তের সংখ্যা ৩৫ মিলিয়ন হবে ২০৫০ সালে। একটি কমিউনিটি তৈরি করার আশু প্রয়োজন যেখানে ক্যান্সারে বিরুদ্ধে লড়াই করা মানুষেরা একে অন্যের অভিজ্ঞতা শুনে অনুপ্রাণিত হবেন। এই বিশ্ব ক্যান্সার দিবস মেডিকা চায় এরকম একটি সাপোর্ট নেটওয়ার্ক তৈরি করতে। 

ডাঃ সৌরভ দত্ত বলেন, 'আমাদের লক্ষ্য শুধু চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়া নয়, মানুষকে স্বাভাবিক জীবন যাপন করার জায়গায় পৌঁছে দেওয়া। এমন একটা জায়গায়, যেখানে পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, জীবনের প্রতিটি দিক যেন উপভোগ করতে পারেন আর এটাই আমাদের মূল লক্ষ্য। এই কারণেই আমরা একটি নাট্য ওয়ার্কশপ আয়োজন করার কথা ভেবেছি, যেখানে শুধুমাত্র যারা ক্যানসারকে পরাস্ত করেছেন তারা যোগদান করতে পারবেন। এটি শুধুমাত্র তাদের মনোবল বাড়াবে নয়, তার সাথে সমস্ত ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইতে থাকা মানুষেরা ইতিবাচক বার্তা পাবেন যে ক্যান্সার জীবনের কিছুই আটকাতে পারেনি।'

বিশিষ্ট অভিনেতার চন্দন সেন বলেন, '২০১০ থেকে ২০১৬ এই ৬ বছর খুব কষ্টে ছিলাম। মনে হয়েছিল, পেশায় ফেরা তো দূরের কথা, আর হয়তো কারো সঙ্গে দেখা হবে না। ডাক্তারবাবুদের চেষ্টা, আমার মনের জোর দুরারোগ্য ক্যান্সারকে হারিয়ে ফিরতে পেরেছি আমি।' তিনি বলেন, 'এই রোগের চিকিৎসা খুবই ব্যয়বহুল। দেশের মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা খুবই সম্পদশালী। তাঁরাই পারেন এই রোগীদের পাশে দাঁড়াতে, তাদের বাঁচাতে।' পাশাপাশি চিকিৎসা ব্যয় কমানো যায় কিভাবে সেদিকে চিকিৎসকদের নজর দিতে পরামর্শ দেন তিনি।

বৈশালী মুখার্জি, একজন ওভারিয়ান ক্যানসার সারভাইভার। তিনি বললেন, 'পাঁচ বছর আগে, আমার ওভারিয়ান ক্যানসার ধরা পড়ে—একটি মুহূর্ত যা আমার জীবন পুরোপুরি ওলটপালট করে দেয়। আমি কখনো ভাবিনি যে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারব। চিকিৎসার পথ ছিল কঠিন, কিন্তু আজ আমি সম্পূর্ণ সুস্থ, বিবাহিত এবং একটি সুন্দর সন্তানের মা। আজ, মেডিকায় আমার প্রথম কর্মদিবস সম্পন্ন করার মাধ্যমে, যেখানে আমার সুস্থতার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচিত হয়েছিল, জীবন যেন এক পূর্ণ বৃত্ত সম্পন্ন করল। আমি এই সুযোগের জন্য কৃতজ্ঞ এবং আশা করি, আমার গল্প অন্যদের অনুপ্রাণিত করবে কখনো হাল না ছাড়তে।'

এই অনুষ্ঠানে, দীপঙ্কর সাহা, কিডনি ক্যান্সারের রোগী তার জীবন কাহিনী বলতে গিয়ে জানান, 'আমার কিডনির ক্যান্সার ধরা পড়েছিল। আমার রেডিক্যাল নেফ্রেক্টমী হয় (এই পদ্ধতিতে পুরো কিডনি এবং তার টিস্যু বাদ দেওয়া হয়) এবং বর্তমানে আমি বিপদ থেকে মুক্ত। এটা ঠিক যে ক্যান্সারের জন্য শরীর থেকে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বাদ গিয়েছে, কিন্তু আমার লড়াই করার ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতে পারেনি। আজকে আমি আগের চেয়ে অনেক ভালো রয়েছি এবং সুস্থ জীবনযাপন করছি। আমি মেডিকার কাছে খুব কৃতজ্ঞ।'

শিবনাথ দত্ত, প্রোস্টেট ক্যান্সারের রোগী, বলেন, 'আমি কেন্দ্রীয় সরকারের হেলথ স্কিমের কর্মচারী। ভেবেছিলাম অবসরের পর জীবন শান্তিতে কাটাব। ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই আমার সহজ নয়। এখন হরমোন থেরাপি চলছে আমার, রোগ এখন অনেকটাই কব্জায় রয়েছে। পরিবারের সাথে আমি এখন জীবনের প্রতিটি দিন উপভোগ করছি। 

দক্ষিণ ২৪ পরগনার হরিনাভিতে বসবাসকারী গৃহবধূ রাখী ভট্টাচার্য, যিনি পেশায় একজন গায়িকা, বলেন, 'অ্যাড্রিনাল টিউমারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে আজ সম্পূর্ণ রোগ নিরাময়, আমার জীবনে কমবেশি চ্যালেঞ্জ এসেছে। মেডিকা ক্যান্সার হসপিটালের এক্সপার্ট কেয়ার পেয়ে আমি আমার সুস্থতা ফিরে পেয়েছি এবং সুর, যা আমার জীবনের অন্যতম ভালবাসার - এখন পরিপূর্ণ জীবন কাটাচ্ছি।'

কার্তিক চন্দ্র ঘোষ বলেন, 'ব্লাডার ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই সহজ ছিল না। যখন এটি ধরা পড়েছিল, তখন এটি প্যাথলজিক্যাল টিউমার পর্যায়ে ছিল। তবে মেডিকা অনকোলজি টিমের সাহায্যে ও সাপোর্ট পেয়ে আমি এখন ক্যান্সার ফ্রি। আমি বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশে কর্মরত রয়েছি এবং বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে খুব আনন্দ পাই - প্রতিটা দিন নতুন করে বাঁচছি আরো আশা আর কৃতজ্ঞতা নিয়ে।'

অয়নাভ দেবগুপ্ত, রিজিওনাল চিফ অপারেটিং অফিসার, মনিপাল হসপিটাল, পূর্ব, বলেন, 'মানুষের মনের জোর যে কোন জিনিসের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। আমরা হাওয়ার গতিবেশ বদলাতে পারব না কিন্তু পাল ঠিক করতেই পারি। তাই যদি ক্যান্সার আক্রমণ করে, আমরা এটা যেন না ভাবি যে সব শেষ হয়ে গেল বা ক্যান্সার আক্রমণ আমরা আটকাতে পারব। তবে আমরা ডাক্তারদের পরামর্শ নিতে পারি আর নতুন উদ্ভাবন আর প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে ও ক্লিনিক্যাল প্রোটোকল নিয়ে রোগের চিকিৎসা করতে পারি। এই বছরের কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থ বাজেটে পরের তিন বছরের মধ্যে প্রতিটি জেলা হাসপাতালে ডে কেয়ার ক্যান্সার সেন্টার গড়ে তোলার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেটা আমাদের অনেক আশা ও সাহস বাড়িয়েছে। আমরা কিছুটা আশ্বস্ত হয়েছি।'‌ তিনি মনকে শক্ত করে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই করার পরামর্শ দেন।

Comments

Popular posts from this blog

*বাসন্তীতে শেষ হলো ৮ দলীয় নক আউট ক্রিকেট টুর্নামেন্ট*

ক্যান্সার বিজয়ীদের কন্ঠে সচেতনতা ও শক্তির গল্প*

মণিপাল হাসপাতাল বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তি ও অ্যাসিড হামলায় আক্রান্তদের সঙ্গে নিয়ে ফার্স্ট এইড ও সিপিআর সচেতনতা বাড়াতে উদ্যোগী